বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দুর্গাপূজা (লিখেছেন অরিন্দম ঘোষাল)

0

লেখক- অরিন্দম ঘোষাল

বাঙ্কিমচন্দ্র bankimchandra


বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দুর্গাপূজা

 



আমাদের সকল উৎসবের মধ্যে দুর্গোৎসব শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই দুর্গোৎসবের ব্যাখ্যা এইভাবে করা যাইতে পারে। ভারতের জ্যোতিষশাস্ত্রে বর্ষের দ্বাদশ মাসকে সংক্রমণ অনুসারে আখ্যাত করা হয়।… তেমনি আবার আশ্বিন মাসে যখন দুর্গোৎসব হয়, তখন ভাদ্রের সিংহ রাশির পর আশ্বিনের কন্যা রাশি। দুর্গা সিংহবাহিনী, কন্যারাশি সিংহের পৃষ্ঠে আসেন। তবে দুর্গা কন্যা নহেন,পুরাণে তাঁহাকে বিবাহিতা দেবী বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি শিবানী ও গণেশ জননী, কিন্তু কথা এই যে, বর্তমান দুর্গোৎসবের দুর্গা-প্রতিমা, কন্যার প্রতিমা না হইলেও, মূল উৎসবে যে কন্যার বা কুমারীর পূজা হইত, যুক্তির যুক্তি হিসাবে এটুকু বলা যাইতে পারে। এমনকী গোড়ায় বোধহয় কন্যা রাশিরই পূজা হইত। এ অনুমান অসংগত হইবে না।

বিশেষত, যে দুর্গার পূজা হইয়া থাকে, সাধারণত লোকে তাঁহাকে ষোড়শী বলে। কন্যা, কুমারী, ষোড়শী একভাবের পরিচয় নহে কী ? অথবা যেমন পুরাতন মদনোৎসবকে দোলযাত্রায় পরিণত করিয়াছেন, তেমনি ইহা সম্ভবপর যে কন্যা রাশির পূজার পরিবর্তে লোকপূজ্যা দুর্গারই উৎসব এ দেশে প্রচলিত রয়েছে।

সময়টা ১৮৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। যুবক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বেথুন সোসাইটির অধিবেশনে হিন্দুর পুজোৎসবের উৎপত্তি কথা পাঠ করেছিলেন, তার মধ্যে দুর্গোৎসব সম্পর্কে উপরের কথাগুলি তুলে ধরেছিলেন। আর হ্যাঁ, বঙ্কিম জীবনী-র রচয়িতা শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের বইতে বাংলা ভাষান্তররূপে এর উল্লেখ পাই। আসলে বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবার ছিল নৈহাটি কাঁঠালপাড়ার বিখ্যাত গোঁড়া হিন্দু এক অতি রক্ষণশীল পরিবার। তাই প্রসঙ্গক্রমে সে ব্যাপারে দু-চার কথা সংক্ষেপে বলা যাক।

বঙ্কিমচন্দ্রের বাবা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক ধর্মপ্রাণ মানুষ। সে যুগের একজন দাপুটে ডেপুটি কালেক্টর। পারিবারিক ঐতিহ্যানুসারে যাদবচন্দ্রের বাড়িতে বছর বছর পালা পার্বণ, পুজো পাঠের আয়োজন হত। কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে ছিল প্রাচীন গৃহদেবতা রাধাবল্লভের বিগ্রহ। এই বিগ্রহকে কেন্দ্র করে চলত এলাহি উৎসব। রাস, রথ, জন্মাষ্টমী, ব্রাক্ষণ ভোজন, কাঙালি ভোজন ইত্যাদি তো ছিলই এছাড়া ছিল জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজো। জমি-জিরেতের আয় কমে গেলেও পালা-পার্বণের খরচ বৃদ্ধি পেত বছর বছর। এর জন্য যাদবচন্দ্রকে প্রচুর ঋণ করতে হত। অবাক করা কথা হল যৌবনের প্রথম দিকে বঙ্কিমচন্দ্র নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর মধ্যে ধর্মভাব জন্মায় বিভিন্ন উপন্যাসে যার প্রতিফলন ঘটেছে। শুধু কি তাই ? পরবর্তীকালে বাড়ির বিভিন্ন পূজা পার্বণ ও সর্বোপরি দুর্গোৎসবে তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৮৬৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র বারুইপুর মহকুমার ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আসেন। সেই সময় তাঁর সহকর্মী ছিলেন কালীনাথ দত্ত মহাশয়। দত্ত মহাশয়ের স্মৃতিকথায় পাই,

তাঁহার জীবনে ঈশ্বর বিশ্বাসের অভাবে আমার বড় কষ্ট হইত। আমি থিওডোর পার্কারের Ten Sermons নামক পুস্তকখানি তাঁহাকে পড়িতে দিলাম। তিনি তাহা গ্রহণ করিলেন এবং সপ্তাহান্তে তাহা আমাকে ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন, Such Worst English I have never read।আমি পার্কারের লেখার ও ইংরেজির খুব ভক্ত ছিলাম। তাঁহাকে হেয়-জ্ঞানসূচক মন্তব্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলাম’। কিন্তু, বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তীকালে মানসিকতার অদ্ভুত পরিবর্তন হয়।

বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মশিক্ষা অংশে পাই,

পিতৃদেবের উপদেশে এবং সংস্কৃত গ্রন্থাদি পড়িয়াই তাঁহার হৃদয়ে প্রথম ধর্মের উদ্দীপনা হয়। আমাদের মাতামহ সেকালে সংস্কৃত শা্স্ত্রে একজন অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি বহু ব্যয়ে ও বহু যত্নে অনেক সংস্কৃত গ্রন্থাদি সংগ্রহ করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থগুলি সেকালে দুষ্প্রাপ্য ছিল, এখন তো বটেই। বঙ্কিমবাবুর সংস্কৃতের দিকে বড় ঝোঁক দেখিয়া আমাদের মাতুল ওই সমুদয় গ্রন্থ তাঁহাকে দিয়াছিলেন। ...এমনকী জ্যোতিষ ও তন্ত্রের পুথিও ছিল। সেজন্য তিনি ফলিত জ্যোতিষ শিখিয়াছিলেন।

এই গ্রন্থগুলি পড়েই বঙ্কিমবাবুর সংস্কৃত শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য জন্মে। তবে ১৮৭৬ সালের শেষের দিক থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের মনে ধর্মভাব প্রবলভাবে আসে বলে জানা যায়।

শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের লেখায় পাই

১২৮২ সালের শেষ ভাগে (১৮৭৬ সাল) বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয়ে ধর্ম্মভাব বন্ধমূল হয়-- আত্মীয়ের সহিত মনোমালিন্য বিদূরিত হয়-- বঙ্গদর্শন পুনরুজ্জীবন করার আয়োজন হয়। ধর্ম্মভাবের সূচনা পূর্ব হইতেই কিছু কিছু হইয়াছিল-- কোন কারণ অবলম্বনে সহসা হৃদয়ে জাগিয়া উঠে নাই। যখন তাঁহার জ্যেষ্ঠা কন্যা আসন্ন প্রসবা, তখন তিনি রাধাবল্লভের মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরের সম্মুখে পদ্মাসনে বসিয়া সাশ্রুনয়নে ঠাকুরকে কত ডাকিয়া ছিলেন। লোকচক্ষুর সম্মুখে এই তাঁহার প্রথম ডাক। তারপর দুই তিন বছর যাইতে না যাইতে বঙ্কিমচন্দ্রকে আবার কাতর হইয়া রাধাবল্লভের চরণে পড়িতে দেখিয়াছিলাম। তখন তাঁহার জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র কঠিন রোগগ্রস্ত-- মরণাপন্ন। বঙ্কিমচন্দ্র কাঁদিতে কাঁদিতে রাত্রি শেষে ঘুমাইয়া পড়িলেন। নিদ্রিতাবস্থায় নবদূর্বাদলশ্যাম বংশীবদন রাধাবল্লভকে স্বপ্নে দেখিলেন। পরদিন ঠাকুরের নির্ম্মাল্য আনিয়া শিশুর মাথায় দিলেন। শিশু অচিরেই আরোগ্য লাভ করিল। তদাবধি বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয়ে ধর্ম্মভাব বদ্ধমূল হইল। ভক্তির ক্ষুদ্র নির্ঝরিণী প্রবাহিত হইল।

আবার বঙ্কিমচন্দ্র শ্রীশচন্দ্র মজুমদার মহাশয়কে একসময়ে যা বলেছিলেন তার উল্লেখ বঙ্কিমবাবু প্রসঙ্গ অংশে পাই। তিনি বলেছেন

আমার জীবনে কতক বড় শিক্ষাপ্রদ, সকল বলিলে লোকে ভাবিবে কি যে এক রকমের অদ্ভুত লোক ছিল। আগে আমি নাস্তিক ছিলাম। তাহা হইতে হিন্দুধর্মে আমার মতিগতি অতি আশ্চর্যরকমে পরিবর্তিত হইয়াছিল। কেমন করিয়া তাহা হইল, জানিলে লোকে আশ্চর্যও হবে।

অতএব দেখা যাচ্ছে নিজেই স্বীকার করছেন। যাক এবার আসা যাক বঙ্কিমচন্দ্রের চিঠিপত্রের মধ্যে বাড়ির দুর্গাপুজো প্রসঙ্গে তাঁর কথায় যা কিনা ভাই ও ভাইপোদের লিখেছিলেন।

১৮৮৭ সালের ১৭ আগস্ট মেদিনীপুর থেকে দাদা সঞ্জীবচন্দ্রকে চিঠিতে লিখছেন

কাঁঠালপাড়ায় স্কুল বা কলেজ বা ইউনিভার্সিটি যাহাই হ’ক, তাহাতে আমি কোন সাহায্য করিব না। কাঁঠালপাড়ার পূজায় আমি টাকা দিব না। এ বছর আমি ও আমার পরিবার পূজার সময় মেদিনীপুরেই থাকিব। সুতরাং কলকাতাতেও পূজা করিতে পারিলাম না। যেখানে বরদা ভট্টাচার্যের মত ব্যক্তি আমাকে জুয়াচোর বলে, যেখানে রামকৃষ্ণ ও ব্রজনাথের মত লোক আমার পিতাকে জালসাজ বলে, যে দেশে বসন্ত ও চন্ডীদাসের মত লোকের সঙ্গে দলাদলি এবং বড়বাবুর মত সহোদরের মুখ দর্শন করিতে হয়, সে দেশের সঙ্গে আর কোন সম্বন্ধ রাখিব না। সেখানে আর কোন দুর্গোৎসব হইবে না।

এই চিঠি থেকে তাঁর রাগ, অভিমানের মনোভাব প্রকাশ পেলেও দুর্গাপূজা বন্ধ বা অশেগ্রহণে তাঁর যে কোনও আপত্তি নেই তা এই চিঠির চার দিন পরেও অন্যান্য চিঠিতে পাই।

১৮৮৭ সালের ২১ আগস্ট সঞ্জীবচন্দ্রকে চিঠিতে লিখছেন,

পূর্ণচন্দ্রের পত্রে জানিলাম আপনি কাঠামো করিয়াছেন।...বিশেষ এবার দুই মাস আগে কাঠামো হইয়াছে। যথেষ্ট সময় ছিল। আর কোন কোন বার আমাকে না জিজ্ঞাসা করিয়া কাঠামো করিয়াছিলেন বটে, আমিও আপনাকে অপ্রতিভ করিব না বলিয়া টাকা দিয়াছিলাম। কিন্তু এইবারও সেইরূপ করা আমার বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যবহার হয় নাই।... যাইহোক, রাগের বশীভূত হইয়া জানি কোন কার্য করা উচিত নহে, যদি কলিকাতায় পূজা করিতে পারিতাম তাহা হইলে কাঁঠালপাড়ার পূজার সঙ্গে সংশ্রব রাখিতাম না। যখন তাহা হইয়া উঠিল না,তখন কাঁঠালপাড়ায় পূজার খরচপত্র কিছু না দেওয়া বা ওই পূজা বন্ধ করা রাগ বা কার্পণ্যের পরিচয় দিবে। অতএব, আমি কাঁঠালপাড়ার পূজায় ২৫০ টাকা দিব। পূর্ণচন্দ্র বোধ করি দেড়শো টাকা দিবেন। চারিশত টাকায় পুজা স্বচ্ছন্দে হইতে পারে। আর বৎসরও ঐরূপ বরাদ্দ হইয়াছিল। কিন্তু আপনি ৪০০ টাকায় পূজা করিতে পারেন নাই। আমি পূজার পর দিয়াছিলাম। এবার দিব না। আমি যাহা স্বীকার করিলাম তাহাতে যদি না কুলাইতে পারেন, পূজা করিবেন না। কলিকাতায় পূজা করিলে সেখানে আমি ২৫০-৩০০ টাকায় কর্ম সমাধা করিতে পারিতাম।..যদি আমাদের পুরোহিত বিশ্বম্ভর ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তবে বলিবেন, কলকাতায় রাখালের নিকট তাঁহার জন্য দুইশত টাকা মজুত আছে। গেলেই পাইবেন। অথবা অপেক্ষা করিলে উমাচরণ লইয়া আসিবে।

আবার ১৮৮৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সঞ্জীবচন্দ্রকে চিঠিতে বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন,

গত রাত্রে রাখাল ও শরৎকুমারী বালক-বালিকাগণ সহিত এখানে পৌছিয়াছে। জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া জানিলাম উমাচরণের গাফিলতিতে যে পঞ্চমীর দিন বাড়ি যাইবার সময় আপনার জন্য টাকা লইয়া যাইবে, উমারণ তাহা লইয়া যায় নাই। আমাদিগের কাহারও কোন ত্রুটি নাই।

আবার শচীশচন্দ্রের বঙ্কিমজীবনীতে পাই

তাঁহার পিতার মৃত্যুর পর হইতে তিনি কাঁঠালপাড়ায় বাস তুলিয়া দিয়াছিলেন, তবে রথ ও দুর্গোৎসব উপলক্ষে দুই-চার দিনের জন্যে মধ্যে মধ্যে কাঁঠালপাড়ায় গিয়ে বাস করিতেন। দেখা যাচ্ছে পারিবারিক মনোমালিন্যের জন্য কাঁঠালপাড়ায় না থাকলেও দুর্গাপুজায় আর্থিক সাহায্য ও যাওয়া ছিল। আবার দুর্গাপূজা নিয়ে তাঁর চিঠিপত্রের দিকে আরেকবার নজর দেওয়া যাক।

১২৯৫ বঙ্গাব্দ ৮ আশ্বিন অর্থাৎ ১৮৮৮ সালে বঙ্কিমচন্দ্র যে এক বিরাট চিঠি সঞ্জীবচন্দ্রকে দেন তাতে পাই

পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রীপত্র যাহা চাই তাহার ফর্দ করিয়া আনিবার জন্য আমি উমাচরণকে আপনার নিকট পাঠাইয়াছিলাম। আপনি তাহা দেন নাই।... যদিও কোনও কারণে পূজার টাকা আগাম দিতে অনিচ্ছুক হই এবং পূজার খরচ স্বহস্তে করিতে ইচ্ছুক হই, এজ্জন্যে পূজার ফর্দ আটক করা আপনার অকর্তব্য। কেন না তাহা ইলে ইচ্ছাপূর্বক দুর্গোৎসবের বিঘ্ন উপস্থিত করা হয়।...পুর্বে প্রতি বৎসর আগাম টাকা দিয়া থাকি, আর এ বংসর টাকা দিই না কেন, তাহা যদি আপনি অভিমানের বশীভূত না হইয়া একটু বুঝিবার চেষ্টা করিতেন তাহা হইলে সহজেই বুঝিতে পারিতেন।...অন্যান্য বৎসর আপনাকে আগাম টাকা পাঠাইয়া ইচ্ছা থাকিলে স্বহস্তে ব্যয় করিবার উপায় ছিল না। গত বৎসর মেদিনীপুরে ছিলাম, তার পূর্ব বৎসর হাওড়াতে আটক ছিলাম। দুই এক ঘন্টার জন্য কলিকাতায় আসিতে পাইতাম। একবারও কাঁঠালপাড়ায় যাইতে পাই নাই। ... এ বৎসর আমি দেশে আছি। পূজা আমার ইচ্ছামতই হইয়াছে। আমি পীড়িত, অতএব যতদূর পারি নিজের তত্বাবধানে পূজার উদ্যোগ সম্পন্ন করাইব। এরূপ ইচ্ছা করা কী এতই অসঙ্গত ব্যাপার!'

প্রসঙ্গত্রমে বলি, এই চিঠির মধ্য দিয়ে জানা যাচ্ছে ১৮৮৭ সালে তাঁদের পুজোর ব্যয় ৫২৫ টাকা সঞ্জীববাবু করেছিলেন। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র আড়াইশো টাকা দেন। তার আগের বছর অর্থাৎ ১৮৮৬ সালে বঙ্কিমবাবু ৩৫০/৩২৫ টাকা দিয়েছেন, বলেও উল্লেখ আছে। আর ১৮৮৮ সালের পুজো তিনি নিজের দায়িত্বে নিতে চান। কেননা দাদা সঞ্জীবচন্দ্রের শরীর খারাপ, মাথায় পীড়া, স্মৃতি বিভ্রম ঘটেছে প্রভৃতির উল্লেখ এই চিঠির মধ্যেই আছে। তাই তো পরেরদিন অর্থাৎ ১২৯৫ সালের ৯ আশ্বিন সঞ্জীববাবুর ছেলে জ্যোতিষচন্দ্রকে চিঠিতে লিখছেন

তোমার পিতা কেমন আছেন? তাহার সম্বাদ লিখিবে। রীতিমত চিকিৎসা করাইবে। খরচপত্রের অকুলান হইলে আমাকে লিখিবে।

আবার দুদিন পরই ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ১১ আশ্বিন মাসে সঞ্জীববাবুকে আবার এক চিঠিতে লেখেন

উমাচরণ বলিয়াছিল, পূজা আপনার, বস্তুত পূজা আপনারও নহে, বা আর কাহারও নহে। পূজা পিতা ঠাকুরের। আমরা কেহ অর্থের দ্বারা, কেহ শারীরিক পরিশ্রমের দ্বারা, যাহার যেরূপ সাধ্য তাই নির্বাহ করিয়া থাকি। আপনি এবার শারীরিক পরিশ্রমে অক্ষম তথাপি আপনার যতদূর সাধ্য, আপনি তাহা করিবেন, আমার হাতে বাধা দিবার অধিকার নাই বা দিব না।...এক্ষণে জানিলাম যে, কিছু কিছু খরচের এক্ষণে প্রয়োজন আছে। অতএব, তাহার নির্বাহ জন্য একুশ টাকা বিপিনের মারফৎ পাঠাইলাম।

আর সত্যি সত্যি কয়েক মাস পর সঞ্জীবচন্দ্র ১৮৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল পরলোক গমন করেন। দাদা সজীবচন্দ্রের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের ভালোবাসা, কর্তব্য, অধিকারবোধ পূর্ণমাত্রায় ছিল।

এবার আসি বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গাপূজা পদ্ধতি প্রসঙ্গে। শচীশচন্দ্রের বঙ্কিম জীবনী অংশে পাই, দুর্গোৎসবের সময় দেবী প্রতিমার পদতলে বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রণত হইতে দেখিয়াছি, কিন্তু সেই প্রণামে বৈচিত্র বা বিশেষ ভক্তি দেখি নাই। সাধারণ লোক যেমন মাথা ঠুকিত, তিনিও সেই রূপ ঠুকিতেন। একবার সন্ধিপূজার সময় তাঁহার যে মূর্তি দেখিয়াছিলাম, সেরূপ মূর্তি আর কখনও দেখি নাই। দালানের এক কোণ প্রতিমা হইতে দূরে, প্রাচীর অবলম্বন করিয়া একা নীরবে দাঁড়াইয়া ছিলেন। হস্ত অঞ্জলিবন্ধ নহে, দৃষ্টিও ঠিক প্রতিমা পানে নহে। দৃষ্টি যে কোন দিকে, তাহা স্থির করিতে পারি নাই। তাহাকে তদাবস্থায় যে দেখিয়াছিল, সেই বুঝিয়াছিল, বঙ্কিমচন্দ্র তখন সম্পূর্ণ বাহ্যজ্ঞান বিরহিত।


--------------------------------------------

সাপ্তাহিক বর্তমান

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

--------------------------------------------

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top