অন্ত্যজ জীবন ভাবনা ও বাংলা উপন্যাস

1
অন্ত্যজ জীবন




সত্তর উত্তর বাংলা উপন্যাসে অন্ত্যজ জীবন

দীনবন্ধু মণ্ডল
আশাদীপ
জুলাই ২০১৫
মূল্য- ১৫০ টাকা।


‘অন্ত্যজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘নীচজাতি’ হলেও ব্যাপকার্থে নিম্নবৃত্তিধারী বঞ্চিত, সর্বহারা মানুষদের বোঝানো হয়ে থাকে। জন্মগত ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কিংবা সামাজিক দিক দিয়ে যেভাবেই অন্ত্যজ মানুষদের সংজ্ঞায়িত করা হোক নয়া কেন চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা যাবে এরা দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে এসেছে। তথাকথিত উচ্চবর্গের মানুষের কাছে এরা চিরদিনই উপেক্ষার পাত্র। সাধারণ ইতিহাসে এদের দেখে মেলে না। উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে ‘নিম্নবর্গ’ ধারণা বহুচর্চিত একটি বিষয় হলেও বাংলা উপন্যাসে নিম্নজীবী মানুষের কথা বিশ শতকের প্রথম থেকেই লক্ষিত হতে শুরু করেছিলো, বিশেষকরে কল্লোল-গোষ্ঠীর লেখকদের লেখায়। পরবর্তীকালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় কিংবা সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখায় যেমন সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের কথা প্রকাশিত হতে শুরু করেছিলো, বিশ শতকের সাত-আটের দশক থেকে সেই ধারা আরো বর্ধিত হলো। ভগীরথ মিশ্রের কথায়,

...বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পের গ্রামীণ ধারাটি, যা তারাশংকর, বিভূতিভূষণ, সতীনাথ ও মানিকের পর শীর্ণ হয়ে পড়েছিল, [এইসময়ে] সহসা আবার বেগবান হল। (আমি ও আমার সময়ের গল্পকার বন্ধুরা)

উপন্যাসের পরিসরে অন্ত্যজজীবন, তার স্বরূপ, এইসব অন্তাবাসী মানুষের বিচিত্র জীবিকার কথা পাশাপাশি ঔপন্যাসিকের নানা দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিষয়গুলিকে মূলকেন্দ্রে রেখে রচিত গ্রন্থটির জন্য লেখক তথা গবেষক দীনবন্ধু মণ্ডল প্রকৃতই ধন্যবাদার্হ। উল্লেখনীয় যে, গ্রন্থটি লেখকের গবেষণা অভিসন্দর্ভের পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত সংস্করণ।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের বিষয়গত ও প্রকরণগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ছিলো। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিশেষকরে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যানে প্রান্তিক মানুষের নিরুদ্ধ স্বর উচ্চারিত হচ্ছিল, সেখানে বাংলা সাহিত্যেও তার আঁচ পাওয়া গেলো। গত শতকের সাত-আটের দশক থেকেই বাংলা সাহিত্যের মূলানুসন্ধানে দেশজ-লোকজ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ বারে বারে ফিরে আসে। এই সময়ের (ছয়-সাতের দশক ও তার পরবর্তী সময়) লেখকরা শহুরে শিক্ষিত হলেও তাঁরা মুখ ফিরিয়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায়। কর্মসূত্রে হোক বা অভিজ্ঞতাসূত্রে, তাঁরা দরদ দিয়ে নিম্নজীবী মানুষের কথা উপস্থাপিত করেছেন তাঁদের গল্পে-উপন্যাসে। ভগীরথ মিশ্র থেকে অভিজিৎ সেন যাঁরা কর্মসূত্রে গ্রামবাংলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন অন্তেবাসী মানুষের বেদনা। এঁরা কেউই নিছক কলম তুলে নেননি। পশ্চিমবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের না জানা মানুষের কথা বিচিত্র মাত্রায় রূপ দিয়েছেন এইসব আখ্যানকাররা। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের লেখক বেছে নিয়েছেন বিশশতকের সত্তর পরবর্তী উপন্যাসসমূহ।


আলোচ্য গ্রন্থের পাঁচটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায়ে লেখক চারজন ঔপন্যাসিকের উপন্যাসসমূহে অন্ত্যজজীবন ভাবনার সামূহিক পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। এই চারজন উপন্যাসকার হলেন – ভগীরথ মিশ্র (১৯৪৭-), নলিনী বেরা (১৯৫২-), সৈকত রক্ষিত (১৯৫৪-) এবং অনিল ঘড়াই (১৯৫৭-২০১৪)। এঁদের উপন্যাসে অন্ত্যজ মানুষের জীবনচর্যা কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এবং তার বিশেষত্বের দিকগুলি গবেষক চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছেন।


গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে (‘সত্তর উত্তর বাংলা উপন্যাসে অন্ত্যজজীবন : স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্য’) গবেষক অন্ত্যজ-নির্ভর বাংলা উপন্যাসের গতিপ্রকৃতির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা অঙ্কন করেছেন। লেখক জানাচ্ছেন, সত্তর দশক পূর্ববর্তী বাংলা উপন্যাসের ধারায় যেভাবে এই প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত মানুষের কথা উঠে এসেছে, পরবর্তী সময়ে তা বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণে লক্ষিত হয়েছে। গবেষকের দাবি,

‘... সত্তর দশক পরবর্তী অন্ত্যজজীবন নির্ভর উপন্যাস বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে নতুন এক সংযোজন।’ (পৃ. ২০)
 
পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে (চারটি অধ্যায়) আলোচনার যে রীতি গৃহীত হয়েছে তা মোটামুটি এইরকম : প্রতিটি অধ্যায় তিনটি অংশে বিভাজিত। প্রথম অংশে উপন্যাসকারের প্রাথমিক পরিচিতি, তাঁর উপন্যাস বা বিষয়ভাবনার আলোচনা; দ্বিতীয় অংশে নির্বাচিত উপন্যাসের পাঠ-বিশ্লেষণ এবং শেষাংশে ঔপন্যাসিক সম্বন্ধে গবেষকের পাঠ পরবর্তী সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভগীরথ মিশ্রের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে। ‘তস্কর’, ‘আড়কাঠি’, ‘চারণভূমি’, ‘জানগুরু’ ও ‘মৃগয়া’ এই পাঁচটি উপন্যাসের আলোচনায় শবর, লোধা, বাউরি, মুর্মু, ডোম, বাগদি, সাঁওতাল প্রভৃতি নিম্নবর্গ সমাজের বিচিত্র জীবন-জীবিকার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।


তৃতীয় অধ্যায়ে নলিনী বেরার ‘ভাসান’, ‘শবরচরিত’, ‘অপৌরুষেয়’, ‘কুসুমতলা’— এই চারটি উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। সংযোজিত হয়েছে ‘শবরচরিত’(২০০৪) উপন্যাসের দীর্ঘ আলোচনা। চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছেন সৈকত রক্ষিত, পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা নির্ভরযোগ্যভাবে যাঁর উপন্যাসে উঠে এসেছে। অখ্যাত এই লেখকের ‘অক্ষৌহিণী’ (ইটভাটার শ্রমিকদের কথা), ‘সিরকাবাদ’ (আখচাষিদের কথা), ‘মহামাস’ (লম্ফ প্রস্তুতকারকদের কথা), ‘মদনভেরি’ (ভেরিবাদকদের কথা) প্রভৃতি উপন্যাসে বিচিত্র সব জীবিকার মানুষের যন্ত্রণাপূর্ণ জীবনের কথা সামনে এসেছে। সর্বশেষ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে অনিল ঘড়াইয়ের উপন্যাস। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতোই অনিল ঘড়াই দলিত শ্রেনি থেকে উঠে এসেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর আখ্যান দলিতের আখ্যান।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে গবেষকের নিরপেক্ষতা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তথ্য বিশ্লেষণে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতটিও উপেক্ষিত হয়নি। চারজন ঔপন্যাসিকের উপন্যাস আলোচনায় গবেষক তুল্যমূল্যের বিচারে কোনো একজনকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে দেখাননি বলা ভালো দেখাতে চাননি। আমাদের ভুললে চলবে না এখানে গবেষকের অন্বিষ্ট অন্ত্যজজীবন ভাবনা ও তার বৈচিত্র্য। এক্ষেত্রে উল্লিখিত চারটি অধ্যায়ে প্রাঞ্জল ভাষায় তা বর্ণিত হয়েছে বলা যায়। এককথায় বিশ্লেষণ নৈপুণ্যে, সুচারু উপস্থাপনায় গ্রন্থটি সুখপাঠ্য হয়েছে, যা অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের ভালো লাগবে আশা করি।

গ্রন্থের শিরোনাম থেকে জানার উপায় নেই কোন সময়পর্ব পর্যন্ত এই গ্রন্থের আলোচনা সীমাবদ্ধ। উপন্যাস আলোচনার নিরিখে বলতে হয়, ১৯৮৯ খ্রি. (নুনবাড়ি – অনিল ঘড়াই) থেকে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের (বৈশম্পায়ন কহিলেন – সৈকত রক্ষিত) মধ্যে প্রকাশিত উপন্যাসগুলিকে আলোচনায় স্থান দেওয়া হয়েছে।  নির্বাচিত ঔপন্যাসিকদের মধ্যে বরিষ্ঠ ভগীরথ মিশ্রের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৯০-এ (‘অন্তর্গত নীলস্রোত’)। যাইহোক, বিশ শতকের শেষ দশক থেকে একবিংশের প্রথম দশক হলো লেখকের অন্বিষ্ট সময়পর্ব। প্রসঙ্গক্রমে এই গ্রন্থটির একটি মূল্যবান অংশের অনুপস্থিতি আমাদের পীড়া দিতে পারে তা হলো – গ্রন্থপঞ্জি। প্রতি অধ্যায়ের শেষে উৎসনির্দেশ সংযোজনের পরেও গ্রন্থপঞ্জি থাকাটা জরুরি বলে মনে হয়। তৎসত্ত্বেও একটি বিষয় প্রশংসনীয় তা হলো নির্দেশিকা সংযোজন। এধরনের গ্রন্থের ক্ষেত্রে পাঠকদের কাছে নির্দেশিকা অনেকখানি স্বস্তির বৈকি।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top